Field note /
তিতাস একটি ভাইরাল ভিডিও হইতে চায় (দৃশ্যপাঠ)
০১
তিতাস একটি নদীর নাম। একটা সিনেমারও নাম। ঋত্বিক কুমার ঘটক ও নাম-ভুইলা-যাওয়া অগণিত সিনেমাশ্রমিকের যৌথনির্মাণ। ১৯৭৩ সালের। অদ্বৈত মল্লবর্মণের লেখা উপন্যাস ছিল এই ন্যারেটিভের ভিত।
ইদানীং সিনেমাটার সতেরো সেকেন্ডের একটা খণ্ডাংশ ভাইরাল হতে চেয়ে ঘুইরা বেড়াইতেছে।কেন? দুই হাজার আঠারোর বাংলাদেশে, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরপর, এর তাৎপর্য কী? কী আছে ক্লিপে?
০২
ইমেজের পাঠ। অবিরল বৃষ্টি। ক্লোজআপে এক নারী। তার প্রোফাইল শট। শুরুতে তিনি ঝাপসা। ব্যাকগ্রাউন্ড স্পষ্ট — একটা নৌকা। মাঝি বাইয়া যায়। সময় বইয়া যায়। ফোকাস স্পষ্ট হয় নারীতে। ছাড়ানো চুল। বুকে গামছা। বৃষ্টির পানি পড়ে গাল বাইয়া। বৃষ্টির ছাঁটে, পরিচালকের ডিজাইন মাইনা, চোখ পিটপিট করতে থাকে নারী।
০৩
সাউন্ডের পাঠ। দৃশ্যত বৃষ্টি, শব্দে তা ক্ষীণ। ফোরগ্রাউন্ডে গান — গানের এক লাইন। পোড়ামুখী, কান্দিস না গো আর। লিডে দোতরা। সঙ্গে বৈঠার আওয়াজ। নৌকা যত দূরে যায়, ডপলার ইফেক্ট মানলে শব্দ তত কইমা আসার কথা। তবু ফিজিক্স অস্বীকার করে, সিনেমা ভাষার উছিলায়, নৌকার শব্দটাই কানের কাছে রাখা। আপনারে শোনানোর জন্য।
০৪
ইমেজ আর সাউন্ড মিলায়া ভিডিওটার সংকেত পাঠ করলে কী দাঁড়ায়? টেক্সট যখন এক কনটেক্সট থেইকা অন্য কনটেক্সটে হাজির হয়, কত মানে, কত পাঠ মাথায় আসে। এই পাঠের কোনো ঠিক-ভুল নাই। আছে পাঠকের অবস্থান, অভিজ্ঞতা আর মনোভঙ্গির ভিন্নতা।
যেমন, কারিগরি পাঠে:
ইমেজটা সাদাকালো, চকচকে, কনট্রাস্ট বেশি
সাউন্ডটা মনো, লো-ফাই, মিনিমালিস্ট
সাদাসিধা পাঠে:
বৃষ্টি মানে বৃষ্টি
নদী মানে নদী
নারী মানে নারী
নৌকা মানে নৌকা
মাঝি মানে মাঝি
গান মানে আবহ সঙ্গীত
হাল ও চাল আমলে নিলে চিহ্ন পাঠ করলে :
বৃষ্টি মানে বিশেষ পরিস্থিতি / আবহ
নদী মানে দেশ / সীমানা / বেড়া / রাষ্ট্র
নারী মানে কান্দনরত জনতা / রাষ্ট্রের প্রান্তিক স্বর
নৌকা মানে একটা রাজনৈতিক দলের প্রতীক / রাষ্ট্রযন্ত্র
মাঝি মানে রাষ্ট্রযন্ত্রের ড্রাইভার
গানটা মানে কান্দন থামানোর আবদার (নাকি নির্দেশ?)
আরও কিছু খুচরা ডিটেইল আমলে নিলে :
নদীটার ভাব শান্ত
নারীটার মুখ শ্রান্ত, দেহটা স্থির
নৌকাটার গতিপথ কাছে থেইকা দূরে
মাঝিটার মাথায় লাগানো মাথাল বৃষ্টি থেইকা বাঁচতে
বৃষ্টিটা এক ধারায় অবিরল
গানটা গাইতেছেন এক পুরুষ
০৬
হয়তো এই সময়ে+স্পেসে ভাইরালকামী মানুষ তার না-বলা ক্ষোভটুকু খুঁইজা পাইছে এই সতেরো সেকেন্ডের ক্লিপে। লক্ষণগুলা এত নিরীহ, এত এনকোডেড, এত রাজনীতি-উদাসীন (এমনটাও হয় নাকি?), যেন তা শেয়ার করলে সাপও (কিছুটা) মরে, লাঠিও (অনেকটা) বাঁচে। সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশের দৃশ্যমালা শেয়ার করার মতো।
০৭
এন্ডনোট —
ক. রাষ্ট্রযন্ত্রের ড্রাইভার কমিউনিটির লোকজন কি ভিডিওটা শেয়ার দিবে? যদি দেয়, তার পাঠ কেমনে করবো?
খ. ঋত্বিকের ডিজাইনে, শট শেষ হয় একটা ফাস্ট প্যান দিয়া। রোজী সামাদের মুখ থেইকা ঠাস কইরা বামে ঘুরে ফ্রেম। ভাইরালে তা বাদ। কেন?
সিনেমার শটটা দেখেন:
তিতাস একটি নদীর নাম, ইউটিউবে
(সময় : 01:46:48 থেকে 01:47:08)
গ. খেয়াল করেন, ০৫ নম্বর মিসিং। সেন্সরড? এডিটিংয়ের ভুল? নাকি ইচ্ছাকৃত/ডিজাইন? যাবতীয় অনুপস্থিতির চিহ্ন কেমনে পাঠ করবো?
তিতাস বইতে চায় তার নদী ও সিনেমার পরিচয় ছাপায়া। তিতাস হইতে চায় প্রতিরোধের ভাষা। তারে পাঠ করেন, পড়েন।